এক কাতারে ধনী-গরিবের স্বাস্থ্যসেবা

0
15

দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানুষের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এবার বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এ খাতকে সত্যিকার অর্থে সেবামূলক করে তুলতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনামতো সব কিছু এগোলে আগামী এক যুগের মধ্যেই অবসান ঘটবে ‘অর্থাভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না’ কিংবা ‘চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যু’ এ ধরনের সংবাদের। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব মানুষ পাবে যথার্থ স্বাস্থ্যসেবা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, গত ১৫ বছর আগে তা ছিল না। তখন দেশে সরকারি পর্যায়ে ১০-১২টি মেডিক্যাল কলেজ ছিল। এর পাশাপাশি জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক মেডিক্যাল কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও ঘটেছে অনেক উন্নতি। তবে রোগীর তুলনায় কম অবকাঠামো, অদক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও প্রযুক্তিগতভাবে আমরা এখনো অনেক দেশ থেকে পিছিয়ে রয়েছি। ভালো মানের স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে সরকারের অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা হলে মানুষ সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। নতুন নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, হাসপাতালগুলোকে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ বছর পর বাংলাদেশের মানুষকে স্বাস্থ্য নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। আগামী ১০-১৫ পরে অসুখ হলে দেশের ধনী-গরিব সবাই একই ধরনের চিকিৎসা পাবে। এটা করতে আমরা প্রতিটি মানুষের হেলথ রেকর্ড ইলেলট্রনিকভাবে সংরক্ষণ ও খোঁজখবর রাখব। তিনি বলেন, দেশে রেফারেল সিস্টেম চালু হলে মানুষ যেখানে বসবাস করে সেখানে যদি তার চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকে তা হলে তাকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হবে। অর্থাৎ আমাদের তত্ত্বাবধানে ওই ব্যক্তি পরবর্তী হাসপাতালে যাবে। অর্থের জন্য মানুষের চিকিৎসার কোনো ব্যাঘাত হবে না। এতে মানুষের মধ্যে একটা আস্থা তৈরি হবে যে, কেউ অসুস্থ হলে তিনি চিকিৎসা পাবেন। এটি হবে ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ (সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা) কর্মসূচির আওতায়। ২০৩০ সালের মধ্যেই এ লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পারব বলে আশা করি।অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বলেছেন, বাংলাদেশে যেসব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোয় কী পরিমাণ এবং কোন ধরনের জনবল দরকার তা জানতে আমি একজন পরামর্শক নিয়োগ করতে বলেছি। আগে আমরা যখন বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরি করেছি তখন এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞের অনুপাত বা সংখ্যা সঠিকভাবে হয়নি। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব থেকে গেছে। এটি আগামী এক দুই বছরের মধ্যে সুরাহা হবে। আশা করি আগামী ৫ বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আনুপাতিক জনবল দেওয়া যাবে। বর্তমানে দেশে ৩৬টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ৬৯টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। এসব মেডিক্যাল কলেজে প্রতিবছর ১০ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন। এ ছাড়া দেশে ৩৫টি বিশেষায়িত হাসপাতাল, ৫৯ জেলা হাসপাতাল, ৪২৫টি উপজেলা হাসপাতাল, ৪ হাজার ৮৬০টি ইউয়িন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সাড়ে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। প্রতিটি জেলা হাসপাতালের আওতায় ২৫ লাখ, উপজেলা হাসপাতালের আওতায় ৪ লাখ, প্রতিটি ইউপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আওতায় ৪০ হাজার ও কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতায় ৬ হাজার মানুষ রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০০৬ সালে দেশে ১৩টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ছিল। বর্তমানে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বেড়ে ৩৬টিতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিনটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিসেস অ্যান্ড ইউরোলজি, জাতীয় নাক-কান ও গলা ইনস্টিটিউটসহ বর্তমানে সারাদেশে ৩৫টি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা হয়েছে। এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মানুষ যেন উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পায় তা নিশ্চিত করতে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর করা তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহেতাশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে। সরকার বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যানসার হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের বড় সমস্যা দক্ষ জনবল। আধুুনিক যন্ত্রপাতি চালানোর মতো দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সেরও। স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবল বাড়ানো না হলে যতই অবকাঠামোগত উন্নয়ন হোক, মানুষ ভোগান্তির শিকার হবেন। তাই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যদি সরকার এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে তা হলে আগামী ১৫ বছর পরে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাপক উন্নতি লাভ করবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক কামরুল হাসান খান বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা আন্তর্জাতিকমানের। এ খাতে আমাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নয়ন হবে। তবে আমাদের অবকাঠামোগত, জনশক্তি ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি আছে। পরিকল্পনায়ও দুর্বলতা রয়েছে। এগুলো থেকে উত্তরণ দরকার। পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, আমাদের সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর অবস্থা আরও করুণ। শিক্ষকের এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এর পর যারা পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক হয়ে বের হচ্ছেন তাদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে আরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এ জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে হবে।

LEAVE A REPLY