কথার প্রভাব নেই বাজারে

0
8

ভারত রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করার পর অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের পেঁয়াজের বাজার। একদিনের ব্যবধানে গতকাল সোমবার পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ৪০-৪৫ টাকা। সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারছেন দাম রাখছেন। গতকাল রাজধানীর কোথাও কেজিপ্রতি পেঁয়াজ ১১০ টাকায়, কোথাও ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা পাইকারদের কাছ থেকে বাড়তি দামে পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আমদানিকারকরা তাদের ফোন করে জানিয়েছেন, ভারত ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৭৫ টাকার নিচে বিক্রি করবেন না। কারণ ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। এ কারণে তারা পাইকারিতে দাম বাড়িয়েছেন। এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব জানান, এখন ডিজিটাল যুগ। ফলে কাউকে জানাতে হয় না। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লে অটেমেটিক্যালি দেশে খবর চলে আসে। গত দুই সপ্তাহ ধরে পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর খুচরাবাজারে পেঁয়াজের কেজি ছিল ৪৫ টাকা। এর পর ভারত রপ্তানিমূল্য বাড়িয়ে দিলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। ১৭ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, দাম দু-একদিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। গতকাল দাম ১১০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও সচিব বলেন, পেঁয়াজের মজুদ সন্তোষজনক। বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এসব কথার কোনো প্রভাবই পড়ছে না বাজারে। দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে, এ ব্যাপারে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিনকে গতকাল প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, দেশীয় ও আমদানি করা পেঁয়াজের সন্তোষজনক মজুদ রয়েছে। এ নিয়েউদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। যারা মজুদ করবেন এবং বাজার অস্থির করার চেষ্টা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ মঙ্গলবার থেকে টিসিবির মাধ্যমে রাজধানীর ১৬ স্থানের পরিবর্তে ৩৫ স্থানে ট্রাকের মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি করা হবে বলেও জানান তিনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাজারে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ খুঁজতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রধান করে ১০টি মনিটরিং টিম করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব টিম বাজার পর্যবেক্ষণ করবে। বিশেষ করে বৃহত্তর ফরিদপুর ও পাবনা অঞ্চলে এসব টিম কাজ করবে। বাজার পরিস্থিতি গত রবিবার সকালেও যে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকায় গতকাল সকালে তা বেড়ে হয়েছে ১১০ টাকা কেজি। রাজধানীর কোথাও কোথাও ১২০ টাকা দরেও বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম ছিল ৯০-১০০ টাকা। রাজধানীর কারওয়ানবাজারের বিক্রমপুর বাণিজ্যালয়ের পেঁয়াজের পাইকার মোহাম্মদ ফয়েজ জানান, রবিবার সকালে পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি করেছি ৭২-৭৫ টাকায়। সন্ধ্যায় দাম বেড়ে হয় ৮০-৮২ টাকা। সোমবার সকাল থেকে দাম আরও বেড়ে হয়েছে ১০০-১০৫ টাকা। তিনি আরও বলেন, সকালে বাজারে সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় অনেক বিক্রেতাই পেঁয়াজ কিনতে পারেননি। এখন পরিস্থিতি এমন যে, বিক্রেতার চেয়ে পেঁয়াজের ক্রেতার সংখ্যাই বেশি বাজারে।
একই কথা জানালেন রাজধানীর মালিবাগ বাজারের পেঁয়াজের পাইকার মো. শাহাবুদ্দিনও। তিনি বলেন, রবিবার থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত দুই লাফে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভারত সরকারের ঘোষণার পর আমাদের অনেক আমদানিকারকের পেঁয়াজের ট্রাক আটকে দেওয়া হয়েছে বর্ডারের ওই পারে। তাই সকাল থেকে মোকামে পেঁয়াজের ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। আমি অনেক কষ্টে ২০০ কেজি পেঁয়াজ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু অনেক ব্যবসায়ী আজ পেঁয়াজ কিনতেই পারেননি।
শ্যামবাজারের মিতালি বাণিজ্যালয়ের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী কানাই সাহা জানান, আমদানিমূল্য বেড়ে যাওয়া পর পরিমাণে কম হলেও পেঁয়াজ আমদানি চালু ছিল। তবে রবিবার ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। শিগগিরই অন্য দেশ থেকে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আমদানি করা না গেলে আগামী কয়েক দিনে দাম আরও বাড়তে পারে। এদিকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিপাল্লা (৫ কেজি) দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫২০ টাকায়। কিন্তু প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা দরে। এ ছাড়া আমদানিকৃত মিয়ানমারের পেঁয়াজের পাল্লা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকায়। অন্যদিকে মুদির দোকানগুলোতে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকা দরে। দাম বাড়ানোর কারণ সম্পর্কে তারা বলেন, দাম আমাদের হাতে নেই। আমরা যে দামে পাই, সে দামেই তো বেচব। মোকামেই দাম বেড়ে গেছে। গতকাল বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ভবিষ্যতে যাতে পেঁয়াজ নিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আমরা কৃষি ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছি। আমাদের ঘাটতি খুব বেশি নয়। যেহেতু আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কাজেই পেঁয়াজ, রসুন, আদা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়েছি। যাতে ভবিষ্যতে আমদানির দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।
ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের খবরে একটু সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে বাণিজ্য সচিব বলেন, আমরা বসে নেই। এ বিষয় নিয়ে আজ (সোমবার) সকালে বসেছিলাম। একটি ভালো খবর হলোÑ মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আনার যে প্রক্রিয়া ছিল, সেটির দুটি জাহাজ এসে পৌঁছেছে নৌবন্দরে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি জাহাজের পেঁয়াজ রবিবার খালাস হয়েছে। এ ছাড়া তুরস্ক ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আনার প্রক্রিয়া চলমান। এটি যে কোনো মুহূর্তে আসতে পারে। এদিকে দেশীয় উৎপাদন না বাড়িয়ে যতই পেঁয়াজ আমদানি করা হোক না কেন, তা কার্যকরী হবে না বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি বলেন, আমদানি করে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে তা টেকসই সমাধান নয়। কাজেই বাজার নিয়ন্ত্রণে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমদানি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে ২৪ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে ২৩ লাখ ৭০ হাজার টন উৎপাদিত হয়। এর ৩০ শতাংশ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময় নষ্ট হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ রয়েছে ১৬ লাখ ৩১ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১১ লাখ ৩১ হাজার টন পেঁয়াজের এলসি খোলা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে এসেছে ১০ লাখ ৯১ হাজার টন। এ হিসাবে চাহিদার চেয়ে মজুদ অনেক বেশি রয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসছে পেঁয়াজ : টেকনাফ প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ মনির জানান, মিয়ানমার থেকে টেকনাফ বন্দর দিয়ে আগের তুলনায় পেঁয়াজ আমদানি বেড়েছে। তবে রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি হলেও বাজারে এখনো দাম কমেনি। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। টেকনাফ বন্দর শুল্ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে এ বন্দর হয়ে গত কয়েক সপ্তাহে সাড়ে ৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এখনো বন্দরে নোঙর করা ট্রলারে এক হাজার টন পেঁয়াজ খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। আরও কয়েকশ টন পেঁয়াজভর্তি একাধিক ট্রলার বন্দরের পথে রওনা দিয়েছে বলে জানা যায়। ব্যবসায়ীরা জানান, মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত পেঁয়াজ স্থানীয় বাজারে চাহিদা মেটানোর পর যাচ্ছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। সেখান থেকে একাধিক হাত বদল হয়ে সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। জানা গেছে, মিয়ানমারের রপ্তানিকারকরা টনপ্রতি গড় দাম ৩৫ হাজার টাকায় টেকনাফ বন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছেন। আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করে মিয়ানমার থেকে আসা পেঁয়াজ টেকনাফ বন্দর কার্যক্রম শেষ করে কেজিপ্রতি গড় দাম দাঁড়ায় ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা মাত্র। তবে টেকনাফের স্থানীয় বাজারেই ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম হাঁকাচ্ছেন কেজি ৮০ টাকা।
টেকনাফ পাইকারি বাজারের মো. শফি সওদাগর, নুরু সওদাগরসহ একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তারা বন্দর থেকে আমদানিকারকদের কাছ থেকে কেজি ৭০ টাকা দামে পেঁয়াজ ক্রয় করেছেন। টেকনাফ বাজারে এনে ১০ টাকা লাভে নিজেরা বিক্রি করছেন ৮০ টাকায়।
টেকনাফ বন্দর শুল্ক কর্মকর্তা মো. আবছার উদ্দিন বলেন, মিয়ানমার থেকে এই বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আসছে। সামনে পেঁয়াজ আমদানি আরও বাড়তে পারে।

LEAVE A REPLY