সনাতন পদ্ধতির সংরক্ষণে পেঁয়াজের এক-তৃতীয়াংশই নষ্ট হয়

0
19

দেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করায় উত্পাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যায়ে মোট উত্পাদিত পেঁয়াজের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ বিশাল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা দেশের পেঁয়াজের সরবরাহ ব্যবস্থা ও দরের ভারসাম্যহীনতার জন্য দায়ী। দেশে উত্পাদিত পেঁয়াজের একটি বড়ো অংশ উত্পাদন হয় ঝিনাইদহ জেলায়। এখানকার চাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মজুত পেঁয়াজের শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ পচে নষ্ট হয়েছে। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় ৬ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়। আর উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার টন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সনজয় কুমার কুন্ডু জানান, পেঁয়াজ উঠানোর আগে বৃষ্টি হওয়ায় পেঁয়াজে জলীয় অংশের পরিমাণ বেশি ছিল। এতে মজুত পেঁয়াজের একটা বড়ো অংশ পচে নষ্ট হয়েছে। পেঁয়াজব্যবসায়ী ফারুক আহমেদ জানান, মজুত পেঁয়াজের ৩০-৩৫ ভাগ পচে নষ্ট হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক পেঁয়াজের দর বৃদ্ধির পেছনে এটি অন্যতম কারণ। তারা জানান, শুধু রবি মৌসুমে পেঁয়াজ চাষ করে দেশের সারা বছরের চাহিদা মিটানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্ষা মৌসুমে চাষ উপযোগী পেঁয়াজের তিনটি জাত উদ্ভাবন হলেও মাঠ পর্যায়ে চাষে প্রসার হয়নি। চাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সনাতন পদ্ধতির পেঁয়াজ সংরক্ষণব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের উপায় খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। এটি পেঁয়াজের সংরক্ষণে নষ্ট হওয়ার হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা গেলে উত্পাদন ও চাহিদার ব্যবধান অনেক কমে আসবে। ফলে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। একই সঙ্গে পেঁয়াজের মৌসুমে কৃষককে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে তাদেরও উত্পাদনে আগ্রহ বাড়বে। পেঁয়াজ চাষে প্রথম দিকে হালকা সেচ লাগে। এরপর উঠানো পর্যন্ত সেচের প্রয়োজন হয় না। পেঁয়াজ ঘরে তোলার আগে শুষ্ক আবহাওয়ার দরকার হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিসের পরিচালক চন্ডি দাস কুন্ডু জানান, গত রবি মৌসুমে সারাদেশে ২ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছিল। পেঁয়াজ উত্পাদন হয়েছিল ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। গত মৌসুমে পেঁয়াজ উঠানোর আগমহূর্তে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে এবং মার্চ মাসে বৃষ্টি হয়। এ বৃষ্টিতে নিচু ও মাঝারি উঁচু জমির পেঁয়াজখেতে পানি জমে যায়। পরে রোদে খেতে জমা পানি গরম হয়ে যায়। এ বৈরি অবস্থায় পেঁয়াজের উত্পাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চাষিরা আবহমান কাল থেকে এ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে আসেছে; কিন্তু এবার মজুত পেঁয়াজে জলীয় অংশের পরিমাণ বেশি থাকায় ব্যাপক পচন ধরে। চাষি ও ব্যবসায়ীরা মাচাংয়ে মজুত পেঁয়াজ বাছাই করে পচাগুলো ফেলে দিতে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট অফিস জানিয়েছে, শুধু যশোর অঞ্চলে নয়। সারা দেশেই বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের ক্ষতি হয়েছে। মজুত পেঁয়াজের মধ্যে আনুমানিক ৩ লাখ টন পেঁয়াজ পচে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট পেঁয়াজ উত্পাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ টন। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ সংগ্রহকালীন ও সংরক্ষণকালীন ক্ষতি বাদ দিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩০ লাখ টন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ১০ দশমিক ৯১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এছাড়া চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২ দশমিক ১৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সবমিলিয়ে মোট পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২৯ দশমিক ৩৪ লাখ টন। অন্যদিকে দেশে প্রতিবছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বর্ষাকালে চাষযোগ্য বারি পেঁয়াজ-২, বারি পেঁয়াজ-৩ ও বারি পেঁয়াজ-৫ জাত উদ্ভাবন করেছে। বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হামিম রেজা জানান, এ জাতগুলো ফেব্রুয়ারি মাসে বীজতলা তৈরি করে মার্চে রোপণ করলে জুন-জুলাই নাগাদ ফসল পাওয়া যায়। জুলাইতে বীজতলা তৈরি করে আগস্টে রোপণ করলে নভেম্বর মাসে পেঁয়াজ উঠে। এসব জাতের হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১০-১২ টন । তিনি আরো জানান, এ জাতগুলো মজুত করা যায় না। উঠানোর পর বিক্রি করতে হয়।

LEAVE A REPLY