বাংলাদেশ প্রতিবেশীর সঙ্গে আলোচনায় বিশ্বাসী

0
29

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সংঘাত নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে বিশ্বাস করে বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটের সমাপনী অধিবেশনে যোগ দিয়ে এ কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রেখে শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়তে সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক আরও উঁচুতে পৌঁছবে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেটাকে প্রধানমন্ত্রী মোদিজি ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গভীর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জ (প্রতিবন্ধকতা) সত্ত্বেও ‘পারস্পরিক স্বার্থ’ এবং অভিন্ন ভবিষ্যৎ নীতির ভিত্তিতে আমরা আমাদের সম্পর্ককে শক্তিশালী ও সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছি। অর্থনীতিসহ বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। চার দফা প্রস্তাব অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনায় চার দফা প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বিগত দশকগুলোয় আমরা অনেক উচ্চাকাক্সক্ষী চিন্তাভাবনা ও উদ্যোগ দেখেছি। এর কিছু সফল হয়েছে, অন্যগুলো বাস্তবতায় আসেনি। আমার দৃষ্টিতে আগামী দশকগুলোর জন্য নিম্নোক্ত চিন্তাভাবনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রথমত আমাদের সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত দ্রুত প্রবৃদ্ধির সময়ে সমাজে যেন বৈষম্য আরও বেড়ে না যায় তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। সম্পদ হতে হবে অন্তর্ভুক্তমূলক এবং তা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছতে হবে। সম্প্রদায় ও দেশসমূহের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা হচ্ছে চাবিকাঠি। আমাদের ভ্রান্ত ধারণা থেকে ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এখন ভারতের সঙ্গে আন্তঃনদী নাব্যতা উন্নয়নে কাজ করছে। আমরা ভারত থেকে ইন্টারগ্রিড সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কিনছি। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের জন্য এ ধরনের সহযোগিতাপূর্ণ সংস্কৃতি প্রয়োজন। অপরদিকে আমাদের বেসরকারি খাত স্বচ্ছ ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। চতুর্থ প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অবশ্যই বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণ করব। আমাদের জনগণের স্বার্থে ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক বাস্তবতার আমরা প্রশংসা করব। আমরা স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বন্ধ করে দিতে পারি না। এর আগে একই দিন নয়াদিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া প্রসঙ্গে হেসে হেসে হিন্দিতে বলেন, হঠাৎ আপনারা বাংলাদেশে পেঁয়াজ পাঠানো বন্ধ করে দিয়ে আমাদের মুশকিলে ফেলে দিয়েছেন। আগামীতে যদি এমন কিছু করেন, তা হলে আমাদের আগে জানিয়ে দেবেন। তিনি তার রাঁধুনীকে রান্নায় পেঁয়াজ দিতে না করে দিয়েছেন বলেও জানান। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা চাই বিনিয়োগ আর ব্যবসাটা একসঙ্গে হোক, যেখানে ভারতের বড় বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে কারখানা খুলে পণ্য উৎপাদন করবে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তারা সেই পণ্য ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিক্রি করতে পারবে। দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। আপনাদের জন্য সঠিক পরিবেশটি নিশ্চিত করতে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপনাদের জন্য টফর্ম তৈরি, আর আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিতে আমরাও প্রস্তুত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় একটি অংশ প্রতিবেশী দেশুগুলোর সঙ্গেই হয় মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, একইভাবে ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন এবং আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে সেই সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি, যার স্বপ্ন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন। আর এভাবেই আমাদের শহীদ আর জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মানটা আমরা দেখাতে পারি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বিগত বছরগুলোয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু এর পাল্লা এখনো ভারতের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে আছে। তিনি জানান, মোংলা, ভেড়ামারা ও মিরসরাইয়ের তিনটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে কেবল ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য। ‘বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করতে চায়’ বাংলাদেশে প্রথাগত খাতের বাইরে শিক্ষা, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ করার জন্য বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে কারও কারও উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা নিবন্ধে বলেন, আমাদেরও অন্য অনেক দেশের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা জানি কিভাবে চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তরিত করতে হয়। শেখ হাসিনা বলেন, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত, পশ্চিমে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যস্থলে অবস্থিত হওয়ায় একটি নির্বিঘœ অর্থনৈতিক স্থান হিসেবে বাংলাদেশের বৈশ্বিক ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণের সুবিধা রয়েছে। আমরা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করতে পারি। আমাদের নিজেদের ১৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ ছাড়াও বাংলাদেশ প্রায় ৩শ কোটি মানুষের সম্মিলিত বাজারের সংযোজক ভূখ- হতে পারে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সিঙ্গাপুরকে পদক্ষেপের আহ্বান মিয়ানমার যাতে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে, সে জন্য ভূমিকা রাখতে সিঙ্গাপুরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সিঙ্গাপুরের উপপ্রধানমন্ত্রী হিং স্যুয়ি কেট গতকাল সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির তাজ হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ আহ্বান জানান। পরে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সিঙ্গাপুরের উপপ্রধানমন্ত্রী হিং স্যুয়ি কেট বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গারা বড় চ্যালেঞ্জ। সচিব বলেন, বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানতে চান সিঙ্গাপুরের উপপ্রধানমন্ত্রী। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার অগ্রাধিকার কৃষি ও শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি করে গড়ে তোলা। সাক্ষাতের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

LEAVE A REPLY