বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে : শেখ হাসিনা

0
14

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্ববাসীর কাছে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুই দেশের মধ্যকার এ সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। কারণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিশ্বসম্প্রীতিতে অনন্য নজির। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে সারাবিশ্বের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর মোদি বলেছেন, এই আলোচনা দুই দেশের জনগণের কল্যাণ ও অগ্রগতিতে আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে। গতকাল শনিবার নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর দুই নেতার উপস্থিতিতে বন্দর ব্যবহার, পানিবণ্টন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উপকূলীয় নজরদারি সংক্রান্ত বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরালো করতে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক, একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর, একটি চুক্তি ও অপরটি একটি কর্মসূচির নবায়ন। এ ছাড়া ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে খুলনায় অবস্থিত ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইনজিনিয়ার্সে বাংলাদেশ-ভারত প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইপিএসডি), রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকায় বিবেকানন্দ ভবন ও বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় এলপিজি আমদানি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া এদিন দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পানিসম্পদ বিষয়ে ছয়টি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় নজরদারি জোরদার, ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম শহরে সরবরাহ, হায়দারাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ও তরুণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিরও নবায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ভারত থেকে এবং দেশটিতে পণ্য আনা-নেওয়ায় স্বাক্ষর হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টেমে (এসওপি)। একইসঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) প্রণয়নে একটি চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, বিগত এক দশকে আমাদের উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রথাগত খাত যেমন নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু ও পরিবেশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জনযোগাযোগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসহ প্রভৃতিতে সহযোগিতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন ও অপ্রচলিত খাত যেমন ব্লু-ইকোনমি এবং মেরিটাইম, পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ গবেষণা, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি ও সাইবার সিকিউরিটিসহ প্রভৃতিতে উভয় দেশের সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব বহুমুখী ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার ফলে আমাদের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশ্ববাসীর কাছ সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্তরূপে পরিগণিত হচ্ছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতেও এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের শুরুর দিকের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, উভয় দেশের মধ্যকার এই সম্পর্কের শুভসূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালে, যখন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণ ও সরকারের অপরিসীম অবদানের কথা আমরা চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা এক মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতে এলপিজি রপ্তানির সিদ্ধান্ত আমাদের উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অধিকতর বেগবান করবে বলে আমি মনে করি। এ ছাড়া এর ফলে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো জ্বালানি চাহিদা পূরণ অনেকাংশে সহজ হবে বলে আমি আশা করছি। এ ছাড়া আট বছর আগে দুই দেশের সরকারের সম্মতি অনুযায়ী বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি আশু স্বাক্ষরের জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিপক্ষীয় ঠকের ব্যাপারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে মূল্য দেয়। সারাবিশ্বের মধ্যে দুই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর মধ্যে সহযোগিতার অনন্য উদাহরণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। আমাদের আজকের এই আলোচনা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও জোরালো করবে। আমাদের বিশেষ এই বন্ধুত্বের লক্ষ্য হলো দুই দেশের জনগণের কল্যাণ ও অগ্রগতি। নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে প্রস্তাবিত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরে ভারতীয় পক্ষ কাজ করছে। এর আগে দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে অবহিত করেছেন যে, তার সরকার ভারতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের জন্য কাজ করছে।
বিবৃতি অনুযায়ী দুই প্রধানমন্ত্রী যুগপৎভাবে অপর ছয়টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনেও দ্রুততার সঙ্গে সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত বিনিময় এবং ফ্রেমওয়ার্ক অব ইন্টেরিম এগ্রিমেন্টের খসড়া প্রস্তুত করার জন্য যৌথ নদী কমিশনের কারিগরি পর্যায়ের কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছেন। টেগর শান্তি পুরস্কার পেলেন শেখ হাসিনা শান্তি প্রতিষ্ঠা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেগর শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির হোটেল তাজমহলে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি আশা মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন সোসাইটির নেতারা। পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে এশিয়াটিক সোসাইটি কলকাতা বলেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি ভূমিকা রাখায় তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। বিশ্বশান্তির অবিসংবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাও এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। পুরস্কার গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ধন্যবাদ জানিয়ে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাকি বিশ্বকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

LEAVE A REPLY