বৈধ লাইসেন্স ছাড়া চলবে না গাড়ি

0
17

২০১৭ সালের ২৯ জুলাই। রাজধানীতে বেপরোয়া বাসের চাকায় পিষ্ট হয় দুই শিক্ষার্থী। প্রতিবাদে রাজধানীর সড়ক অবরোধ করে টানা কয়েক দিন আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ সে গানে শিক্ষার্থীরা সড়কে চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহনের গাড়ির কাজগপত্র ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে। তারা বেশিরভাগ গাড়ির বৈধ লাইসেন্স পায়নি। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরে। তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রশিক্ষিত চালকের লাইসেন্স নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীদের এ দাবিই চিন্তার খোরাক জোগায় উত্তরা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী বেলায়েতের মনে। পুরো নাম বেলায়েত হোসাইন আনসারি। তিনি চিন্তা করলেন এমন একটি ডিভাইস (যন্ত্রাংশ) আবিষ্কার করবেন, যা দিয়ে সহজেই চালকের লাইসেন্স চেক করা যাবে। অর্থাৎ এটি হবে এমন একটি যন্ত্রাংশ, যা গাড়িতে স্থাপন করলে চালকের লাইসেন্স না থাকলে সে গাড়ি চলবে না। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী বেলায়েত উদ্ভাবন করলেন তার কাক্সিক্ষত ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স সাপোর্টেড (ডিএলএস) কার স্টার্টিং ডিভাইস’। ডিভাইসটি সারাদেশের গাড়িতে স্থাপন করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা চান বেলায়েত। নিজের উদ্ভাবিত ডিভাইস নিয়ে আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন তরুণ এ উদ্ভাবক। তিনি বলেন, ডিভাইসটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো সড়কে ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানো রোধ এবং অদক্ষ ড্রাইভাররা যেন গাড়ি না চালাতে পারে। সড়কে দুর্ঘটনার কারণ অদক্ষ চালক। এ বিষয়টি ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী করে। বেশিরভাগ চালকেরই বৈধ লাইসেন্স নেই। অর্থাৎ তারা বিআরটিএর পরীক্ষা ছাড়াই সড়কে গাড়ি চালায়। ফলে প্রতিদিনই সড়কে শত শত প্রাণ ঝরছে। বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। আমি মনে করি বিআরটিএ থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত একজন দক্ষ চালক গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও কমবে। বেলায়েত বলেন, গত প্রায় ১ বছর ধরে গবেষণা করে ডিভাইসটি তৈরি করেছি। ডিভাইসটির কাজ হলো গাড়িকে অদক্ষ চালকের হাত থেকে নিরাপদে রাখা। ডিভাইসটি কোনো গাড়িতে স্থাপনের পর গাড়িটির স্টার্টিং, মোটর ও ইগনেশন সিস্টেম ডিভাইসটির অধীনে চলে আসবে। তার পর থেকে গাড়িটিকে স্টার্ট করতে হলে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রেস করতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ডিভাইসটি স্ক্যান করবে। স্ক্যানে যদি এটা সরকার অনুমোদিত হয়, তা হলে গাড়ির স্টার্টিং মোটর ও ইগনেশন সিস্টেমকে সচল করবে। তারপর ড্রাইভার গাড়িটিকে প্রচলিত নিয়মে চাবি দিয়ে স্টার্ট করতে পারবেন। যদি ড্রাইভিং লাইসেন্সটি ডিভাইস স্ক্যান করে দেখে এটা সরকার অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়, তা হলে স্টার্ট দেওয়া যাবে না। ভুয়া লাইসেন্সধারী চালক কোনো গাড়ি চালু করতে চাইলে ওই গাড়ির মালিক বা সংশ্লিষ্টদের কাছে মেসেজ চলে যাবে। তরুণ এই উদ্ভাবক আরও বলেন, আমি মনে করি রাজধানীসহ সারাদেশে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালকের হাতে স্টিয়ারিং থাকায় প্রতিদিন অকালে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। বেলায়েত বলেন, ডিভাইসটি স্থাপন করতে খরচ হবে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের সব যানবাহনে ডিভাইসটি স্থাপন করা সম্ভব হবে। ফলে লাইসেন্স ছাড়া কেউ গাড়ি চালাতে পারবে না। এতে সড়কে দুর্ঘটনাও কমে আসবে। পরিবহন সেক্টরে এটি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলেও মনে করেন তিনি। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র বেলায়েত হোসাইন আনসারির জানান, তিনি আরও একটি ডিভাইস আবিষ্কার করেছেন। ‘অটোম্যাটিক রেললাইন ডিসকানেকটিং অ্যালার্মিং সিস্টেম’। ডিভাইসটি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) বিজ্ঞান মেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। রেললাইন যদি কোনো কারণে ডিসকানেক্ট হয়ে যায়, তা হলে ডিভাইসটি স্টেশনমাস্টারকে সতর্কতা জানান দেবে। বেলায়েতের এই উদ্ভাবনকে স্বাগত জানিয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন আমাদের সময়কে বলেন, গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা এ রকম অনেক ভালো উদ্ভাবনের খবর জানতে পারি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলো আলোর মুখ দেখে না। কারণ সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এসব উদ্ভাবন বেশি দূর এগোতে পারে না। সুতরাং বেলায়েত যে ডিভাইসটি তৈরি করেছে, একে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) এগিয়ে আসতে হবে। তারা ডিভাইসটির সম্ভাব্যতা যাছাই করে একে কাজে লাগাতে পারেন। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এ রকম উদ্ভাবন বেশিদূর এগোয় না বলেও মন্তব্য করেন নিরাপদ সড়ক চেয়ে গত দুই যুগ ধরে আন্দোলন করে আসা ইলিয়াস কাঞ্চন। এ প্রসঙ্গে বিআরটিএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।

LEAVE A REPLY