মোহাম্মদপুরে আ.লীগ নেতা মিজানের অপরাধসাম্রাজ্য

0
14

এক সময় ছিলেন ফ্রিডম পার্টির বড় নেতা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে তার বাসায় হামলা করেছিল যারা, সেই দলেরও একজন তিনি। অথচ সময়ের স্রোতে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। ভোল পাল্টে গেছে তার, পাল্টে গেছে নামটি পর্যন্ত। তিনি এখন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা; রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গড়ে তুলেছেন অপরাধ সাম্রাজ্য। মাদক কারবার থেকে শুরু করে খুন-খারাবি পর্যন্ত নানা অপরাধমূলক কা-ে তার নাম উঠে এসেছে বারবার। আওয়ামী লীগের এ নেতার নাম হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান। আগে তিনিই ছিলেন মিজানুর রহমান মিজান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান মিজানের নামে মোহাম্মদপুর থানায় ১৯৯৬ সালে ইউনূস হত্যা এবং ২০১৬ সালে সাভারে জোড়া খুনের মামলা রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্প এলাকায় মাদক কারবারের অন্যতম নিয়ন্ত্রণকারীও তিনি। মাদক কারবারে নেপথ্য পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। মানুষের জমি জবরদখলের কারণে বেশ কয়েকবার জেলও খেটেছেন মিজান। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড মাতব্বর তুহিন ইয়াবা কারবার করে শূন্য থেকে কোটিপতি বনে গেছেন। সূত্র জানায়, ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ধানম-ির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা চালায় ১০-১২ জনের একটি দল। এ দলে ছিলেন তৎকালে ফ্রিডম পার্টির বড় নেতা মিজানও। দলটি সেখানে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গুলি চালা। এ সময় শেখ হাসিনা বাড়ির ভেতর অবস্থান করছিলেন। তার বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরাও পাল্টা গুলি চালালে হামলাকারীরা একপর্যায়ে কেটে পড়ে। অনুসন্ধানে জানা যায়, শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাকারীদের অন্যতম ছিলেন মিজানুর রহমান মিজান। এ কা-ে ধানম-ি থানায় মামলা হয়। ১৯৯৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার অভিযোগপত্র দেয়। এতে লে. কর্নেল (অব) সৈয়দ ফারুক, লে. কর্নেল (অব) আবদুর রশিদ ও মেজর (অব) বজলুল হুদা এবং নাজমুল মাকসুদ মুরাদসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাও ছিলেন হামলাকারী দলের সদস্য। মোহাম্মদপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোস্তফা ১৯৯৫ সালে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং এরও পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে মিজানুর রহমান নিজের নাম পাল্টে ফেলেন, হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। পরে এক সময় ফ্রিডম পার্টি ছেড়ে ভেড়েন আওয়ামী লীগে। তিনি এখন মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা, আগের কমিটিতে তিনিই ছিলেন থানার সাধারণ সম্পাদক। এলাকায় তার খুবই দাপট। সম্প্রতি কাউন্সিল হয়েছে মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের। নতুন কমিটির তালিকা প্রকাশ না হলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ কমিটিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে দেখা যেতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে ফ্রিডম পার্টির পক্ষ থেকে মিজান, শামীম জালালী ওরফে দারোগার ছেলে শামীম, বাবুল ওরফে পিচ্চি বাবুলসহ কয়েকজন লিবিয়া যান গেরিলা ট্রেনিং নিতে। হামলার ঘটনার সময় মিজান ছিলেন ফ্রিডম পার্টির ধানম-ি-মোহাম্মদপুর জোনের কো-অর্ডিনেটর। সূত্র জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মিজান ঢাকায় এসে মোহাম্মদপুর এলাকায় শুরু করেন চাঁদাবাজি, ছিনতাই। ছিনতাইকারী হিসেবেই ১৯৭৪/৭৫ সালে তার বিশেষ পরিচিতি আসে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি খামারবাড়ী খেজুরবাগান এলাকায় ছিনতাই করার সময় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়ায় মসজিদের পাশে পুকুরে নেমে পড়েন। পুলিশ তাকে বারবার নির্দেশ দিলেও তিনি পুকুর থেকে ওঠেননি। ৪-৫ ঘণ্টা পর তিনি পরনের কাপড় ছাড়াই উঠে আসেন। এমন আচরণে পুলিশ তাকে পাগল বলে ছেড়ে দেয়। তখন থেকেই এলাকায় তার নাম ছড়িয়ে পড়ে পাগলা মিজান নামে। এ বিষয়ে হাবিবুর রহমান মিজানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি। এদিকে গত রবিবার জমি দখলকে কেন্দ্র করে যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ৬ জনকে গুলি করে আহত করে। এদের মধ্যে একজন নিখোঁজ হন। ঘটনার দুদিন পর গত মঙ্গলবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবরি দল তুরাগ নদীতে তল্লাশি চালিয়ে সিলিকন রিয়েল এস্টেটের ইট সরবরাহকারী যুবক জুয়েল দাশের লাশ উদ্ধার করে। এ হত্যাকা-েও উঠে এসেছে হাবিবুর রহমান মিজানের নাম। পুলিশসহ স্থানীয়রা জানান, রবিবার দুপুরে সিলিকন রিয়েল এস্টেটের জমি দখলকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুর এলাকার যুবলীগ নেতা আরিফুল ইসলাম তুহিন, আওয়ামী লীগ নেতা পাগলা মিজান, আদাবর এলাকার ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ আহম্মেদ ও সাইফুল তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় সন্ত্রাসীরা সিলিকন রিয়েল এস্টেটের ৬ কর্মীকে গুলি এবং আরও ১৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা জুয়েল নামের এক কর্মীকে গুলি করে আহত করার পর ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা করে এবং তার লাশ তুরাগে ফেলে দেয়। এ ব্যাপারে সিলিকন রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সারোয়ার খালেদ অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসীরা তার এস্টেটের জমি অন্যায়ভাবে দখল করতে এলে বাধা দেওয়া হয়। এ সময় বাধা দিলে দখলদাররা তার প্রতিষ্ঠানের ৬ কর্মীকে গুলি করে, কুপিয়ে জখম করে আরও ১৪ জনকে।

LEAVE A REPLY