সংবাদপত্রের একাল-সেকাল

0
14

ঘুম থেকে উঠে দরজার সামনে থেকে খবরের কাগজ তোলা আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে। সকালে খবরের কাগজে চোখ না বোলালে সারা দিনটাই কেমন এলোমেলো লাগে। নাশতার টেবিলে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়া কিংবা অফিসে যাওয়ার পথে গাড়িতে খবরের কাগজে চোখ বোলানো মধ্যবিত্ত বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। ১৮১৮ সালে প্রথম বাংলায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সে হিসাবে বাংলায় সংবাদপত্র প্রকাশকাল ২০০ বছর পেরিয়ে এসেছে। খুব কম সময় তো নয়! খবরের কাগজ কেন পড়ি আমরা? এর কোনো প্রয়োজন আছে? না পড়লেই বা কী? দিব্যি ঘর-সংসার চলতে থাকবে। তাহলে কেন কিনি প্রতিদিন! একটা প্রয়োজন হয় মাঝে মাঝে, কোনো সনদ হারিয়ে গেলে পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়। চাকরি-বাকরির খোঁজ করতে গেলে পত্রিকার বিজ্ঞাপনের দিকে নজর দিতেই হয়। চাকরি-বাকরি পেয়ে গেলে তো সে প্রয়োজনও ফুরায়। তাহলে? মানুষ পড়ে আনন্দের জন্য। আর খবরের কাগজ পড়ে জানার জন্য। দৈনন্দিন ঘটনাবলি, রাজনীতি, বিনোদন, ব্যবসা, শেয়ারের ওঠানামা, নিজের এলাকার খবর—সবকিছু জানতে চায় খবরের কাগজের পাতায়। টিভিতে ঘটনা দেখার পরেও বিস্তারিত জানার জন্য খবরের কাগজের পাতা উলটাতেই হয়। খবরের কাগজ মানুষকে দিকনির্দেশনাও দেয়। দেয় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ। জানা যায়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য তখনকার সংবাদপত্রগুলো পুনর্জন্মের কাহিনি-সংবাদ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপত। আবার মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তীকালে দেশের মানুষ রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি ও আন্দোলনের নির্দেশনা লাভ করত সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকেই। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকসহ কয়েকটি দৈনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে সংবাদপত্রের জগতে মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাক সেই সময়ে জনমানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার অনুকরণীয়, উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাই সংবাদপত্র বা খবরের কাগজ হলো একটি লিখিত প্রকাশনা, যার মধ্যে থাকে বর্তমান ঘটনা, তথ্যপূর্ণ নিবন্ধ, সম্পাদকীয়, বিভিন্ন ফিচার ও বিজ্ঞাপন। এর দাম মানুষের হাতের নাগালে রাখা হয়, যাতে যে কোনো আয়ের মানুষ তা কিনতে পারেন। মালিকপক্ষ প্রধানত বিজ্ঞাপনের আয় থেকে সেই খরচ মেটান।

সংবাদপত্র বনাম ইলেকট্রনিক মিডিয়া

সংবাদপত্রের বিশাল সাম্রাজ্য যখন গড়ে উঠেছে, তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়া নতুন করে তার জায়গা নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেখানে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়ছে, সেখানে উন্নত বিশ্বে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা কমে আসার পাশাপাশি বাড়ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতি ঝোঁক। টিভি বা রেডিও নিউজ বুলেটিন তো রয়েছেই, অনলাইন নিউজ পেপার মূলত সংবাদপত্রের বিকল্প হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেট ও স্মার্ট ফোনের প্রসারের কারণে এই অনলাইন নিউজ সেবার দিগন্ত অবারিত হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এমি মিশেল ও জ্যাস হলকম পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে সংবাদপত্রের গ্রাহক ৭ শতাংশ কমে গেছে। সেই সঙ্গে বিজ্ঞাপন পাওয়ার হার কমেছে ৮ শতাংশ। অন্যদিকে টিভিতে প্রাইম টাইম নিউজ দেখার দর্শক বেড়েছে ৮ শতাংশ। আর বিজ্ঞাপনের হার বেড়েছে ১০ শতাংশ। এর কারণে বিশ্ব জুড়ে প্রায় সব জনপ্রিয় সংবাদপত্র তাদের অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলতে বাধ্য হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোর অনলাইন নিউজ পের্টালগুলোও ধীরে ধীরে ব্যবসাসফল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ট্রিবিউন একটি জনপ্রিয় দৈনিক। এই পত্রিকা ২০১৩ সাল থেকে চার দিন প্রিন্ট ভার্সন প্রকাশ করা শুরু করেছে। বাকি তিন দিন এটি অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হচ্ছে। পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, পত্রিকা প্রকাশের খরচের কারণে এটি লাভজনক থাকছে না। এছাড়া, পৃথিবীর অনেক নামি-দামি সংবাদপত্র তাদের প্রিন্ট সংস্করণ বন্ধ করে দিয়ে শুধু অনলাইন চালু রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজ ফিড।

সংবাদপত্রের শুরু

সংবাদপত্রের সেকাল খুব বেশি দিনের কথা নয়। পঞ্চদশ শতকে মুদ্রণযন্ত্র উদ্ভাবনের পরে এর বিকাশ। প্রাক-আধুনিককালে রাজা-বাদশারা ‘ফরমান’ জারি করতেন, রাজভৃত্যরা তা যথাস্থানে পৌঁছে দিত, কিংবা ঢ্যাড়া পিটিয়ে জরুরি সংবাদ জানিয়ে দেওয়া হতো প্রজাদের। প্রজার খবরও রাজার কাছে পৌঁছে যেত গুপ্তচর মারফত। সে হিসেবে পৃথিবীর প্রাচীন সংবাদপত্র ধরা হয় ‘অ্যাক্টা ডানিয়া’কে (acta diurna)। প্রাচীন রোমে খ্রিষ্ট জন্মের ৫৯ বছর আগে জুলিয়াস সিজার ‘অ্যাক্টা ডানিয়া’ পত্রিকা বাজার, জনসাধারণের চলাচলের পথে সাঁটানোর নির্দেশ দেন। সেই পত্রিকায় এখনকার সংবাদপত্রের মতোই সব ধরনের খবরই ছাপা হতো। গ্ল্যাডিয়েটরদের খবর, অপরাধ, বিয়ে, ধনী ব্যক্তিদের খবর, সামরিক বাহিনী ও রাজনীতির খবরও থাকত সে পত্রিকায়। পাথরে বা ধাতুতে খোদাই করে সংবাদ পরিবেশন করা হতো সে পত্রিকায়। এরপর চীনের হ্যান ডাইনেস্টিতেও পত্রিকার প্রচলন ছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে ‘ডিবাও’ নামের সেই পত্রিকা সরকারিভাবে প্রকাশিত হতো। ৭১৩ শতক থেকে ৭৩৪ শতকে ট্যাং ডাইনেস্টি ‘কাইয়ুআন যা বাও’ শিরোনামে সরকারি খবর প্রকাশ করত। সিল্কের কাপড়ে হাতে লেখা সেই পত্রিকা শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রকাশিত হতো। আধুনিক ইউরোপের শুরুর দিকে অস্ট্রিয়ার ভেনিস থেকে হাতে লেখা মাসিক খবরের পাতা বের হতো। খুব কম দামে কেনার সুযোগ ছিল। কিন্তু এসবের কোনোটাই পূর্ণাঙ্গ সংবাদপত্র ছিল না বা সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতো না। তবে আধুনিক সংবাদপত্রের সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকাটি হচ্ছে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত ‘রিলেশন’। ১৬০৫ সালে এটির প্রকাশনা শুরু হয়। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পরে মূলত সংবাদপত্র প্রকাশের সুযোগ অবারিত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে জার্মান অধ্যুষিত শহর স্ট্র্যাসবুর্গের জোহান ক্যারোলাসে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

আধুনিক সংবাদপত্রের শুরু

১৬৯০ সালে বেঞ্জামিন হ্যারিসের হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। সে সময় এই সংবাদপত্র যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মূলত সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে ইংল্যান্ডে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। তখনকার দিনে বেশিরভাগ খবরই ছিল কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর বা গোত্রের। ১৭০২ সালের আগে সাপ্তাহিক বা মাসিক হিসেবেই সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো, প্রতিদিন সংবাদপত্র প্রকাশ করা হতো না। সব ধরনের খবরে ভরপুর ছিল সংবাদপত্রগুলো। ১৭৭৬ সালের দিকে লন্ডনে মোট সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল ৫৩টি, জন ওয়াল্টার ১৭৮৫ সালে ‘দ্য লন্ডন টাইমস’ প্রকাশ করলে বিশ্বব্যাপী হইচই পড়ে যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ পত্রিকাটির সার্কুলেশন দাঁড়ায় ৫০ হাজার। ১৭২৫ সালে উইলিয়াম ব্রাডফোর্ড নিউইয়র্ক গেজেট নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন, এ পত্রিকা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পেনি প্রেস বাজারে আসার পর সংবাদপত্র জনগণের কাছে আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৩৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে ডেইলি নিউইয়র্ক সান প্রকাশিত হয়। ১৮৪১ সালে দ্য নিউইয়র্ক ট্রিবিউন নামে এটি বের হয়। ১৯১৯ সালে দ্য লেটার পত্রিকাটি শিকাগোর তিনটি প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করা হতো। দ্য ডেইলি নিউজ যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে খুবই জনপ্রিয় একটি পত্রিকা। এদিকে, প্রাভদা ও ইজভেসটিয়া রাশিয়ার বিখ্যাত পত্রিকা। ইয়োমিউরি শিমবুন পত্রিকা সবচেয়ে বেশি বিক্রিত পত্রিকা। প্রতিদিন এটি ১ কোটি ৪০ লাখ ৬৭ হাজার কপি বিক্রি হয়। দ্বিতীয় অবস্থানেও রয়েছে জাপানি পত্রিকা ডেইলি আসাহি শিমবুন এটি প্রতিদিন ১ কোটি ২ লাখ ২১ হাজার কপি বিক্রি হয়।

ভারতবর্ষে সংবাদপত্র

মুসলমান রাজত্বকালে ভারতবর্ষে সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল। অবশ্য তখন সংবাদপত্র মুদ্রিত হতো না, সমস্ত রাজনৈতিক সংবাদ হাতে লেখা হতো এবং তা দেশের প্রধান প্রধান রাজকর্মচারীর নিকট পাঠানো হতো। তাছাড়া বিভিন্ন প্রদেশের সংবাদ এক করে সম্রাটের কাছে দেওয়া হতো। কানুন এ-জং নামক প্রাচীন পারস্য গ্রন্থে লেখা আছে যে, ১৫২৬ সালের পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর শাহ শিবিরে বসে সংবাদপত্র পাঠ করছিলেন এমন সময়ে হিন্দু রাজারা এসে সন্ধির প্রস্তাব করেন। আবুল ফজল আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে লিখেছেন, সম্রাট আকবরের সময় প্রতি মাসে গভর্নমেন্ট গেজেটের মতো রাজকীয় সমাচারপত্র প্রচলিত ছিল।

বাংলায় সংবাদপত্র

বাংলা সংবাদ-সাময়িকপত্র প্রকাশের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন শ্রীরামপুরের ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা। ১৮১৮ সালে মিশনের পক্ষে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র দিগ্দর্শন। এর ২৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটিতে ইংরেজি প্রবন্ধও প্রকাশিত হতো। ১৮২১ সালের পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়। দিগ্দর্শন প্রকাশিত হওয়ার একমাস পর ১৮১৮ সালের ২৩ মে মার্শম্যান প্রকাশ করেন সমাচার দর্পণ। ১৮৩২-৩৪ পর্যন্ত পত্রিকাটি ছিল দ্বি-সাপ্তাহিক এবং ১৮৪১ সাল পর্যন্ত এর প্রকাশনা অব্যাহত ছিল। বাঙালি সম্পাদিত প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক বাঙ্গাল গেজেটিও প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের মে মাসে। সম্পাদক ও মালিক ছিলেন হরচন্দ্র রায়। বছর খানেক পত্রিকাটি চলেছিল। এর কোনো কপি পাওয়া যায়নি। এ ধরনের পত্রিকা বা সাময়িকপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত সংবাদ পরিবেশন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনা করা; তবে এর মাধ্যমে বাংলা গদ্যেরও অনেক উন্নতি হয়। ১৮১৮ থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত প্রধানত কলকাতাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি বাংলা সংবাদ-সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়; যদিও সেগুলো তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। বলা যেতে পারে, বাঙালির কাছে সংবাদপত্র উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে ১৮৩১ সালে, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত সাপ্তাহিক সংবাদ প্রভাকর প্রকাশের ফলে। এটি বাংলা সাময়িকপত্রে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করে

পূর্ববঙ্গে সংবাদপত্র

১৮৫৭ সালের আগে প্রকাশিত দুটি সংবাদপত্র ব্যতীত ১৮৫৭ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত তত্কালীন পূর্ববঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল ৭৬টি সংবাদপত্র ও ১৬২টি সাময়িকপত্র। ১৮৫৭ সালের আগে প্রকাশিত সংবাদপত্র ধরলে মোট সংখ্যা হয় ২৫২। একই সময়ে অখণ্ড বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল মোট ৯০৫টি বাংলা সংবাদ-সাময়িকপত্র। এ পরিসংখ্যান পূর্ববঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতির অবস্থা তুলে ধরে। তবে নানা দিক থেকে পশ্চাত্পদ তত্কালীন পূর্ববঙ্গেও এ সংখ্যা একেবারেই অকিঞ্চিত্কর নয়।

LEAVE A REPLY