চোরের ওপর বাটপাড়ি

কথায় বলে- চোরের ওপর বাটপাড়ি। সেটাই যেন বাস্তবে করে দেখাল দুই প্রতারক। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সরকারি-বেসরকারি ৫ শতাধিক ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ কর্মকর্তার কাছ থেকে তারা হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত অর্ধকোটি টাকা। চার বছর ধরে এমন অপকর্ম করে বেড়ানো ওই দুই ভুয়া দুদক কর্মকর্তাকে গত শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এর পরই বেরিয়ে আসে তাদের প্রতারণার কাহিনি।কখনো দুদক চেয়ারম্যান বা কমিশনার, কখনো সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইলে ফোন দিত তারা। বলত, ‘হ্যালো, আমি দুদকের কমিশনার বলছি। আপনার বিরুদ্ধে কিছু ফাইল জমা পড়েছে।দুর্নীতির অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছে। আমি মামলার তদন্ত করছি। বাঁচতে চাইলে দেখা করুন।’ এভাবে মোবাইল ফোনে হুমকি-ধমকি দিয়ে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৫ শতাধিক ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে ৪০-৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক আনিসুর রহমান বাবুল ও তার সহযোগী ইয়াসিন তালুকদার। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর হাজারীবাগের সনাতন গড় বউবাজার ও নবীপুর লেনের একটি দোকান থেকে তাদের আটক করে র‌্যাব-২। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিকাশ হিসাবসহ ২১টি মোবাইল ফোন ও ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা ২৬টি সিমকার্ড।গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব ২-এর কোম্পানি কমান্ডার (সিপিসি-৩) মহিউদ্দিন ফারুকী। তিনি বলেন, গত ২৭ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে র‌্যাবের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করা হয়। এর ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে ওই দুজনকে আটক করা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতারণার শিকার ওই ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিশ্চয়ই দুর্নীতিগ্রস্ত। তা না হলে তারা প্রতারণার শিকার হতেন না।দুর্নীতিগ্রস্ত নন এমন কর্মকর্তারা দুদকে অভিযোগ করাতেই প্রতারণার বিষয়টি নজরে আসে। যারা দুর্নীতির মামলার তদন্তের কথা শুনে বিকাশে টাকা দিয়েছেন, যোগাযোগ করেছেন, তাদের ব্যাপারেও র‌্যাব তথ্য সংগ্রহ করছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতারকচক্রের মোবাইল ফোনে যোগাযোগকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে যদি দুদক চায় তারাও তদন্ত করতে পারেন বা দুদক যদি দায়িত্ব দেয় র‌্যাবও বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে।গ্রেপ্তার দুজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, চক্রটির ৭ থেকে ১০টি গ্রুপে ৫০ জনের মতো সদস্য রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। এ জন্য তারা বিকাশ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করত। এরা কখনো কক্সবাজার, কখনো বরিশাল, চট্টগ্রাম বা মাদারীপুর থেকে টাকা সংগ্রহ করত।তিনি আরও জানান, চক্রটি প্রথমে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যবেক্ষণ করে। এর পর টার্গেট কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে দুর্নীতির মামলা দায়েরের ভয় দেখায়। এতে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয় পেয়ে তাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করতেন।তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক অভিযান জোরদারের পর প্রতারকচক্র নতুন কৌশলে নামে। তাদের টার্গেটকৃতদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক, ভূমি অফিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পুলিশ, এনজিওসহ উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২০১৪ সালে মাদারীপুরের রাজৈরের এক প্রতারকের মাধ্যমে বাবুল এ চক্রের সঙ্গে কাজ শুরু করে। হাজারীবাগের একজন টেলিকম দোকানদারের সহায়তায় তারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতিয়ে নিয়ে সেগুলো দিয়ে সিম রেজিস্ট্রেশন ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলত।প্রতারক বাবুল জানায়, এইচএসসির পর ফ্লেক্সিলোড ও বিকাশ এজেন্টের ব্যবসায় নামে সে। বিভিন্ন দোকানে গার্মেন্টসকর্মী, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ নিম্নবিত্ত মানুষ নতুন সিম কিনতে গেলে তাদের সিম ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করে এবং তাতে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলত সে। কয়েকবার একটি সিম ব্যবহারের পর সেটি ফেলে দিত চক্রের সদস্যরা।বিকাশ এজেন্ট ইয়াসিন তালুকদারের হাজারীবাগে ৪২/১ নবীপুর লেনে সাইফুল এন্টারপ্রাইজ টেলিকম নামে একটি দোকান রয়েছে। বাবুলের কাছ থেকে উদ্ধার ১৪টি বিকাশ সিমে গত ছয় মাসে ৮ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার কাছে ১০ লাখ টাকার একটি চেক পাওয়া গেছে। আর ইয়াসিনের কাছ থেকে উদ্ধার ১২টি বিকাশের সিমে ১ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। এই চক্রের আরও ৭-৮ জন পলাতক রয়েছে এবং আটকদের একজন গুরুর বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে র‌্যাব।