ডাকসু নিয়ে সিরিয়াস আ.লীগ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর মতো ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ বিজয় চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আসন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে (ডাকসু) বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা। শুরুতে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে দোটানা থাকলেও এখন তা নেই, ডাকসু নির্বাচনকে ‘সিরিয়াসলি’ নিচ্ছেন তারা।অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডাকসু নির্বাচনে গঠিত কমিটির সংস্কার করে সব শিক্ষককে কমিটিতে স্থান দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছে বিএনপি।আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ডাকসুর নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পর ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীকে ডেকে ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে খোঁজখবর নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি ও ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ নেতাদের ‘জয়ের সম্ভাবনা’র বিষয়ে খোঁজ নেন তিনি। এর পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতা বেগবান করে ছাত্রলীগ।বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী দুজনই ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। সভাপতি শোভন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ সম্পাদক রব্বানী ক্রিমিনোলজি বিভাগের এমফিল পর্বের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন দুজনই ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।এদিকে ডাকসু নির্বাচনের দলীয় বিষয়টি দেখভাল করতে এবং ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিতে গত শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় চার নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার আওয়ামী লীগ সভাপতি ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা এবং ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম, বিএম মোজম্মেল হক, উপদপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী উপস্থিত ছিলেন।ঢাকার বাইরে থাকায় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডাকসু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যতম নেতা আখতারুজ্জামান, তিনি ডাকসুর ভিপি ছিলেন।  
বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের ভূমিকা ও করণীয় কী হবে সে বিষয়ে আমরা সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নির্দেশনা দিয়েছি। আমরা আশা করছি, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জয়লাভ করবে।একই বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন আমাদের সময়কে বলেন, ডাকসু নির্বাচনসহ সব ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে আমরা খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটির সঙ্গে বৈঠক করে ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব আমরা।বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বলা হয়েছে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। ডাকসুর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে পৃথক পৃথক প্যানেল দেবে ছাত্রলীগ। হল সংসদে কারা প্রার্থী হতে পারেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও করতে বলা হয়েছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতাকে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মন জয়ের জন্য শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচিও হাতে নিতে বলা হয়েছে।এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, মোটকথা হলো-দেশের অন্যান্য নির্বাচনের মতো ডাকসু নির্বাচনেও আমরা জয় চাই। এ জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ছাত্রলীগকে। কারণ ২৯ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ডাকসু নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। কোনো অবস্থাতেই এ নির্বাচনে ছাত্রলীগ পরাজিত হোক তা চায় না আওয়ামী লীগ।ছাত্রলীগের একাধিক প্রার্থী ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে সমস্যা হবে কিনা জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল আমাদের সময়কে বলেন, ছাত্রলীগের অসংখ্য পদপ্রত্যাশীর মধ্য থেকে দুজনকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়েছে। ডাকসুতেও একইভাবে ভিপি ও জিএস প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। বড় সংগঠন অনেক প্রার্থী থাকবে এটিই স্বাভাবিক।ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে গঠনতন্ত্র সংশোধনে পাঁচ সদস্যের এবং নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়নে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিএনপির দাবি, নির্বাচনকে একপক্ষীয় করতে শুধু আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের এসব কমিটিতে রাখা হয়েছে। বিএনপিপন্থি কোনো শিক্ষকের ঠাঁই হয়নি। তাই বিএনপির পক্ষ  থেকে এসব কমিটির সংস্কার করে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের কমিটিতে স্থান দিয়ে ডাকসু নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়েছে।ইতোমধ্যে ডাকসু নির্বাচন কেন্দ্র করে বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানীকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ডাকসু নির্বাচনের জন্য ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তারা সবাই ইতিবাচক; কিন্তু তারা মনে করে, নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য যেসব কমিটি করা হয়েছে, সেসব কমিটির পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তারা ডাকসু নির্বাচনের গঠনতন্ত্র ও কমিটিগুলোর সংস্কার চান।ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রস্তুতি কমিটির প্রধান শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, আমরা ডাকসু নির্বাচন আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে ছাত্রদলের মতো অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনেরই দাবি, ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে করা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেসব দাবির প্রতি তোয়াক্কা না করে একটি বিশেষ দলকে খুশি করতে ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলের ভেতরে করেছে, যা কাম্য নয়। তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য যে কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে, তা আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের দ্বারা করা হয়েছে। বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের এতে রাখা হয়নি। যদি এসব কমিটি সংস্কার করা না হয়, তবে ডাকসু নির্বাচন একপক্ষীয় হবে। তাই প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদেরও এসব কমিটিতে রাখা হোক।ক্যাম্পাসে ডাকসু নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই উল্লেখ করে বিএনপির এ নেতা বলেন, গত বেশ কয়েক বছর ধরেই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে গেলে ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা করে। গত বুধবারও এক ছাত্রদল নেতাকে মারধর করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার বিচার চেয়ে এবং দোষীদের শাস্তি দাবি করে লিখিত অভিযোগও দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকে শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। আমি বলতে চাই, ক্যাম্পাসে ডাকসু নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই।নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল নিয়ে তিনি বলেন, প্যানেল নিয়ে আমরা এখন পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা করিনি। আমরা বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা প্যানেলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তবে যারা সাধারণ শিক্ষার্থীর কাছে জনপ্রিয়, তাদের দ্বারা প্যানেল গঠন করা হবে।আগামী ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।