১০ বছর ধরে জুতা পাচ্ছেন না ৩ হাজার কর্মচারী

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের অন্য বিমানবন্দরগুলোয় কর্মরত আছেন ৩ হাজার ২শ সিভিল এভিয়েশন (সিএবি) কর্মচারী। এসব বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি যাত্রীদের প্রথম দর্শন হয় এসব কর্মচারীর সঙ্গে।প্রবাদ আছে, ‘প্রথমে দর্শনধারী, তার পর গুণবিচারী’ অর্থাৎ গুণ বিচারের আগে পোশাক-পরিচ্ছদে রুচির বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। নিরাপত্তারক্ষীসহ সিবিএর কর্মচারীদের আচার-ব্যবহার, পোশাক-পরিচ্ছদেও বিদেশিরা বাংলাদেশের বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অনেকটা ধারণা পেয়ে থাকেন।গত ৩ বছর ধরে একই ড্রেসে বিমানবন্দরগুলোয় দায়িত্বপালন করছেন সিএবির কর্মচারীরা। শুধু তাই নয়, ১০ বছর ধরে তারা পাচ্ছেন না কোনো জুতা-মোজা। ড্রেসগুলোও পুরনো হওয়ায় অনেকটা মলিন এবং নোংরা হয়ে গেছে। কর্মচারীরা সেই পোশাক পরেই ডিউটি করছেন। বাধ্য হয়ে অনেকে ড্রেসকোড মানছে না। ইচ্ছামতো ড্রেস পরেই দায়িত্ব পালন করছেন। এতে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক ধারণা পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশিদের কাছে; ক্ষুণ্ন হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি। অথচ সিএবির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি দুই বছর অন্তর কর্মচারীদের মানসম্মত নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ, জুতা-মোজা সরবরাহ দেওয়ার কথা। কিন্তু নিজেদের গড়া সেই নিয়ম মানছে না খোদ সিএবিই।কর্মচারীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় নতুন ড্রেস না পাওয়ার কারণেই তারা পুরনো বা ভিন্ন ড্রেস পরে ডিউটি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সর্বশেষ গত ১২ সেপ্টেম্বর সিএবির ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির নারী-পুরুষ কর্মচারীদের জুতা-মোজা সরবরাহের জন্য সিএবির প্রশাসনিক শাখায় পাঠায় স্যাম্পল কমিটি। কিন্তু অদ্যাবধি আলোর মুখ দেখেনি সেই সিদ্ধান্ত।সিবিএর সার্বিক এ অব্যবস্থাপনার বিষয়ে গত ১৭ অক্টোবর ‘সিএবিতে এক ইউনিফর্মে ৩ বছর ডিউটি করছেন ৩ হাজার কর্মচারী’! শিরোনামে দৈনিক আমাদের সময়ে একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন ছাপা হয়। এর পর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। পোশাক সরবরাহে প্রথম দিকে তোড়জোড় শুরু হলেও এখন ফাইল চালাচালিতেই আটকে আছে সিভিল এভিয়েশনের তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির করা সেই টেন্ডার প্রক্রিয়া।এদিকে জুতা-মোজা সরবরাহে সিভিল এভিয়েশনের ৩ সদস্যবিশিষ্ট অপর একটি কমিটি গত ২৭ অক্টোবর দুটি কোম্পানির জুতা মনোনীত করে সিএবির চেয়ারম্যানের দপ্তরে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। মনোনীত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, বে-এম্পোরিয়াল লিমিটেড ও মেসার্স বাটা সু। প্রতি পুরুষ কর্মীর জুতার দাম ধরা হয় ১ হাজার ৭০১ টাকা; মোজার দাম নিরূপণ করা হয় ১৩৫ টাকা। আর নারী কর্মীদের জন্য প্রতি জোড়া জুতার দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৪৩১ টাকা; মোজা ১৩৮ টাকা। এর পর সিএবির উপপরিচালক (সরবরাহ) সেমছু মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রধান করে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয় চলতি বছরের গত ৮ জানুয়ারি।কমিটিকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের কথা জানিয়ে বলা হয়। সিবিএতে কর্মরত সাধারণ ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পুরুষ ও নারী কর্মচারী এবং নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ও দৈনিকভিত্তিক নিরাপত্তা কর্মচারীদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী পোশাক-পরিচ্ছদের অংশ হিসেবে জুতা-মোজা সরবরাহের জন্য সরবরাহকারী ৩টি প্রতিষ্ঠানের (অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড, মেসার্স বাটা সু কোম্পানি লিমিটেড ও বে-এম্পোরিয়াম লিমিটেড) সঙ্গে চুক্তিপত্রের শর্তাবলি পিপিআর ২০০৮-এর আলোকে প্রস্তুতকরণের জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।এ প্রসঙ্গে কমিটির প্রধান সিএবির উপপরিচালক (সরবরাহ) সেমছু মো. মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বিভিন্ন কাজের চাপে কর্মচারীদের জুতা সরবরাহের বিষয়ে গঠিত কমিটির সদস্যরা এখনো মিটিং করতে পারেননি। দ্রুত সময়ের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।সিবিএর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পুরুষ কর্মচারীদের গ্রীষ্মকালীন পোশাক এবং নারী-পুরুষদের শীতকালীন পোশাক কেনার জন্য স্পেসিফিকেশন প্রস্তুতের জন্য সিভিল এভিয়েশন একটি কমিটি গঠন করে গত ২৫ এপ্রিল। ৭ সদস্যবিশিষ্ট ওই কমিটিকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন পোশাকের মধ্যে রয়েছে-সেলাই করা সাদা টেট্রন কাপড়ের ফুল শার্ট ও হাফ শার্ট; সেলাই করা কালো ও নেভি ব্লু পলিস্টার গেভার্ডিন কাপড়ের ফুল প্যান্ট। এক ইঞ্চি চওড়া একটি চামড়ার বেল্ট। পুরুষদের জন্য ট্রপিক্যাল কাপড়ের কোট-প্যান্ট এবং নারীদের জন্য ট্রপিক্যাল কাপড়ের কোট। গত হয়েছে গ্রীষ্মকাল, শীতও শেষ হতে চলেছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই কমিটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে রিপোর্ট দাখিল করতে পারেনি। সিএবি কর্তৃপক্ষ বলছে, টেন্ডার জটিলতার কারণে কর্মচারীদের তারা নতুন ড্রেস দিতে পারছেন না।সিএবি সূত্র জানায়, সিএবির নিয়ম অনুযায়ী কর্মচারীদের দুই বছর অন্তর অন্তর নারী নিরাপত্তারক্ষী, স্ক্যানিং অপারটের, অ্যালাউন্সম্যানসহ সব ধরনের কর্মচারীকে জনপ্রতি মানসম্মত একই রঙের এবং একই ডিজাইনের নতুন দুটি শাড়ি, জুতা ও মোজা পাওয়ার কথা। সর্বশেষ ২০১৫ সালে পোশাক পেয়েছিলেন কর্মচারীরা।