‘আমি মা হব এটাই কি আমার অপরাধ’

বেগম হোসনে আরা বীণা। সপ্তাহখানেক আগেও তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। এরও আগে ছিলেন বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। পরিশ্রমী এই নারীর নয় বছরের দাম্পত্য জীবনে কোনো সন্তান না থাকায় বুকের কোণে একটা কষ্ট জমা ছিল। তবে বহু চেষ্টা-চিকিৎসার পর গত বছর গর্ভধারণ করেন। এ অবস্থায় ছুটি না নিয়ে সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদনির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কিন্তু কে জানত দায়িত্ববোধই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ এক সরকারি আদেশে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়।বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি হোসনে আরা। প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়েন। সেদিন রাতেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। মানসিক আঘাতের কারণে গর্ভের সন্তানের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়, কমে যায় অক্সিজেন সরবরাহ। তাই চিকিৎসকরা ওই রাতেই ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নেন। পরে ৫ ফেব্রুয়ারি অপারেশন করে অপরিপক্ব শিশুর জন্ম দেওয়া হয়। অথচ আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝিতে তার ডেলিভারির কথা ছিল। হোসনে আরা ও তার সদ্যপ্রসূত সন্তান এখন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শিশুসন্তানটিকে রাখা হয়েছে আইসিইউতে।প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পাওয়া হোসনে আরা গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ফেসবুকে হৃদয়স্পর্শী একটি স্ট্যাটাস দেন। তাতে বলেছেন, প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কারসাজিতেই তাকে ওএসডি করা হয়েছে। তবে এই নারী কর্মকর্তার আবেগঘন স্ট্যাটাসটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রশাসনে শুরু হয়েছে তোলপাড়। শুধু মাতৃত্বজনিত কারণে ওএসডি করায় উপজেলা প্রশাসনেও চাপা ক্ষোভ।হোসনে আরার স্ট্যাটাসটি হুবহ তুলে ধরা হলো : ‘…আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে এ পদে যোগদান করি। আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু সাড়ে ৫ মাস পূর্বে জানতে পারি আমি দুমাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়, এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।’‘আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত ফাঁকিবাজি, এ বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম করিনি। অথচ আমি সন্তানসম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলির পাঁয়তারা করেই চলেছিল। সন্তানসম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এ সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এ জন্য আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অ্যাপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।’‘আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি। তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই ছিলাম। কিন্তু গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে রেগুলার চেকআপ করতে হাসব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি। চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমরা হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য, এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায়, আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।’‘আমার অপরাধ হলো আমি সন্তানসম্ভবা, আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির। খবরটা শোনার পর আমি মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি। উল্লেখ্য, আমি অ্যাজমার রোগী। প্রচণ্ড মানসিক চাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষণিক হসপিটালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রিমেচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে!’সদ্য ওএসডি হওয়া এই ইউএনও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্ষোভের সুরে আরও লেখেন, ‘আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল, আমি জানি না! তবে জানি একজন সব দেখেন, তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের ওপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তাব্যক্তির কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলব, তুমি এর বিচার করো! আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন, তারা নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’এদিকে ফেসবুক স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে রবিবার সকালে হোসনে আরা বীণার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাকে ওএসডি করার নেপথ্যে কারা কাজ করেছে সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না; কারণ আমি অসুস্থ। আমি হাসপাতালে, বাচ্চাটাও অসুস্থ। অর্ডারটা কারও না কারও হাত দিয়েই হয়েছে। আমার কষ্টের জায়গা একটাই যে, আমি মা হব। এটাই কি আমার অপরাধ? আমরা একসময় বদলি হব, এটাই স্বাভাবিক। একটা নির্দিষ্ট সময় পরে চেয়ারটা অবশ্যই খালি হবে। কিন্তু আমার ডেলিভারির সম্ভাব্য সময় ছিল আগামী এপ্রিলে। তার মানে নির্দিষ্ট সময়ের আড়াই মাস আগেই আমার ডেলিভারি হয়েছে। কেন এখন আমাকে এ মুহূর্তে ওএসডি করা হলো? ওএসডি করার কারণে আমি এতটাই বিপর্যস্ত এবং অসুস্থ হয়ে যাই যে, এর প্রভাব আমার গর্ভের সন্তানের ওপর পড়ে। এতে আমার সন্তানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে তাকে তড়িঘড়ি সিজার করে বের করে ফেলতে হয়েছে। এ অন্যায়টাই আমি মেনে নিতে পারিনি। এটাই আমার কাছে খারাপ লেগেছে। আমি অসুস্থ থাকায় বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গেও কথা বলতে পারিনি।’