‘পোড়া লাশটা হইলেও দাও’

পড়ার টেবিলে থরে থরে সাজানো বইখাতা; টেবিল ঘেঁষেই ওয়ারড্রোবের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চিরুনি ও লিপস্টিকসহ কয়েকটি প্রসাধনী। পাশের ছোট্ট টেবিলে রাখা কালো গিটার। কক্ষের দেয়ালে আঁকা ছবি, খাটে পাতা বিছানা-বালিশ, আলমারিতে সারি সারি করে রাখা পরনের কাপড়Ñ সব কিছুই আছে আগের মতোই; নেই কেবল ফাতেমা-তুজ জোহরা বৃষ্টি। মেয়ের জামা, আঁকা ছবি হাতড়ে সেই খাটে বসে বিলাপ করছেন মা শামসুন্নাহার। বুক চাপড়ে পাগলের মতো বলছিলেনÑ ‘ও আল্লাহ, আমার এত বড় সর্বনাশ কেন করলা? আমার বৃষ্টির লাশটা তুমি ফিরাইয়া দাও।’ কিছু জানতে চাইলে শুধু বললেনÑ ‘আমার মেয়েকে চাই, ওকে এনে দাও; পোড়া লাশটা হইলেও দাও।’ গতকাল দুপুরে লালবাগের হাজি রহিম বক্স লেনের বৃষ্টিদের ৪১/১ নম্বর ভাড়া বাড়িতে গিয়ে এ হৃদয়বিদারক দৃশ্যই দেখা যায়। গত কয়েক দিন ধরেই এ অবস্থা চলছে বলে জানান বৃষ্টির দাদি আয়শা খাতুন।নাতনি নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়েই গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থেকে ঢাকায় চলে এসেছেন তিনিও। কেঁদে কেঁদে তারও চোখের জল যেন শুকিয়ে গেছে। পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর থেকে নিখোঁজ বৃষ্টি। সঙ্গে থাকা শৈশবের বান্ধবী রেহনুমা তারান্নুম দোলারও খোঁজ মিলছে না। তাদের পরিবার বলছেÑ বুধবারের ভয়াল অগ্নিকা-েই হারিয়ে গেছে তাদের আদরের ধন। অভিন্ন ধারণা পুলিশেরও; কিন্তু এখনো দুই বান্ধবীর লাশের খোঁজ মেলেনি। ২০ ফেব্রুয়ারি, দিনটি ছিল বুধবার। শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি সংগঠন প্রজন্ম কণ্ঠের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সেদিন বিকালে একসঙ্গে লালবাগের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে চাইল্ড কেয়ার বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী বৃষ্টি এবং তার বান্ধবী ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের আইনের শিক্ষার্থী দোলা। পরনে ছিল শখের শাড়ি, খোঁপায় ফুল। রাতে অনুষ্ঠান শেষে রিকশায় করে তারা বাসায় ফিরছিলেন। তবে একুশে ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নিরাপত্তাজনিত কারণে রিকশা ঘুরিয়ে দেওয়ায় বৃষ্টিরা চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকা হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। রাত ১০টা ১৭ মিনিটে দোলার সঙ্গে ফোনে শেষ কথা হয় তার পরিবারের। তখন দোলা জানিয়েছিলেন, তারা বেগমবাজারে আছেন। রাস্তায় প্রচ- জ্যাম, বাসায় ফিরতে আরও ১০ মিনিট লাগতে পারে। রিকশাটি চুড়িহাট্টার পোস্ট অফিস গলিতে এলে ভাইকে সেলফোনে বৃষ্টি বলেছিলেন- বাসার কাছাকাছি তারা। হঠাৎ সেই ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর থেকেই দুই বান্ধবীর ফোন বন্ধ। এ বিষয়ে লালবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন দোলার বাবা দুলালুর রহমান দুলাল। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, দোলা আর বৃষ্টি ওই রাতে শিল্পকলা একাডেমি থেকে অনুষ্ঠান শেষে তাদের লালবাগ এবং হাজি রহিম বক্স লেনের বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন। চকবাজার এলাকায় ভয়াবহ সেই অগ্নিকা-ের ঘটনায় এখনো খোঁজ মেলেনি অনেকের। প্রতিদিনই নিখোঁজদের খোঁজে ঘটনাস্থল ও ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে ভিড় করছেন স্বজনরা। সেই তালিকায় বৃষ্টি ও দোলাও। চুড়িহাট্টার অগ্নিকা-ের শিকার হয়েছেন ধারণা করে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যালসহ আশপাশের হাসপাতালগুলোয় ছুটে যান তাদের স্বজনরা। কিন্তু পোড়া মৃতদেহ থেকে বৃষ্টি ও দোলাকে শনাক্ত করতে পারেননি তারা। তবে গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে এবং পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ীÑ এ দুই বান্ধবীর স্বজনরা নিশ্চিত হয়েছেন, তারা আর বেঁচে নেই। এদিকে অগ্নিকা-স্থল থেকে উদ্ধার ৬৭টি দগ্ধ লাশের মধ্যে ১৯টি কেউ শনাক্ত করতে পারেননি। বৃষ্টি ও দোলার পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও ২৩ পরিবার লাশগুলোর দাবিদার। তাই নিহতদের প্রকৃত স্বজনের হাতে তুলে দিতে এ ২৩ পরিবারের ৫৮ জনের ডিএনএ নমুনা নিয়েছে সিআইডি। এ দুরবস্থার মধ্যেই প্রতারণার শিকার হয়ে লাখ টাকা খুইয়েছে অসহায় দুটি পরিবার। প্রতারকরা দুই বান্ধবীকে ফেরত দেবে বলে সেই টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যদিও গতকাল শনিবার পর্যন্ত প্রতারক কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বৃষ্টির ভাই সাইদুল ইসলাম সানি আমাদের সময়কে বলেন, ‘সিসি টিভি পর্যবেক্ষণের পর পুলিশ জানিয়েছে, ওই ৬৭ লাশের মধ্যে আমার বোন ও বান্ধবীও রয়েছেন; কিন্তু ১০ দিনেও বোনের লাশ পেলাম না। বৃষ্টির চিন্তায় মায়ের অবস্থাও দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। কিছু চাই না আমরা, বোনের পোড়া লাশটুকু আমাদের ফিরিয়ে দিন।’ কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সানি। বৃষ্টির দাদি আয়শা খাতুন বলেন, ‘অগ্রণী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে বৃষ্টি ও দোলার বন্ধুত্ব। বিভিন্ন সময়ই তারা একসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেত। তাদের সূত্রে দুই পরিবারেরও সখ্যতা। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে বৃষ্টি সবার বড়। তার এক ভাই সানি এইচএসসি পরীক্ষার্থী, ছোট ভাই সামি জাবের শুভ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে।’ বৃষ্টির কক্ষের দেয়ালে আঁকা ছবি আর টেবিল ভরা বই দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়শা খাতুনও। লালবাগ থানার ওসি সুবাস চন্দ্র সাহা বলেন, ‘মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে ওই দুই বান্ধবীর শেষ লোকেশন ও হায়দার বক্স লেন থেকে পাওয়া একটি ভিডিও ফুটেজে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, চুড়িহাট্টার অগ্নিকা-েই তাদের করুণ মৃত্যু হয়েছে। আর নিহতদের পরিবারের কাছ থেকে যারা প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।’